বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা কমেছে
মূলত ভিন্নমত প্রকাশ করার কারণে ব্লগার হত্যা ও আইসিটি অ্যাক্টের আওতায় পুলিশি হয়রানীর কারণে বাংলাদেশের মানুষ নিজেরাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে।
(প্রিয় টেক) বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও স্বাধীনতায় অন্যান্য অনেক দেশের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের কোন হস্তক্ষেপ নেই। মূলত ভিন্নমত প্রকাশ করার কারণে ব্লগার হত্যা ও আইসিটি অ্যাক্টের আওতায় পুলিশি হয়রানীর কারণে বাংলাদেশের মানুষ নিজেরাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে।
‘ফ্রিডম অব দ্য নেট ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বেসরকারি পর্যবেক্ষক সংগঠন ফ্রিডম হাউস এসব তথ্য প্রকাশ করেছে। ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়লেও এ ক্ষেত্রে মানুষের স্বাধীনতা গত ৫ বছর ধরে কমছে। ব্লগ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমত প্রকাশকারীদের ওপর সরকারি দমনপীড়ন বেড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদনে বলা হয়, অনলাইনে ভিন্নমত প্রকাশের কারণে চলতি বছরেই ৪জন ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে। গত বছর ইন্টারনেট স্বাধীনতায় সরকারের হস্তক্ষেপ না বাড়লেও এসব হত্যাকাণ্ড এবং এর সঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের আওতায় ধরপাকড়ের কারণে একধরনের ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা এখন নিজেরাই অনলাইনে নিয়ন্ত্রিত আচরণ করে।
স্বাধীন ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ২০১৪ সালের অবস্থান থেকে কিছুটা পিছিয়েছে বাংলাদেশ। তবে এখনো ‘আংশিক স্বাধীন’ অবস্থানই রয়েছে বাংলাদেশের। এবারের মূল্যায়নের ৩টি পর্যায়ে বাংলাদেশের মোট নম্বর ৫১। এর মধ্যে ইন্টারনেটে ঢোকার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ২৫-এর মধ্যে ১২, কোনো লেখায় বাধার ক্ষেত্রে ৩৫-এর মধ্যে ১২ ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর অধিকার আটকানোর ক্ষেত্রে ৪০-এর মধ্যে ২৭ নম্বর পেয়েছে বাংলাদেশ।
১০০-এর মধ্যে পয়েন্ট যত কম হবে, সেই দেশটি ইন্টারনেট স্বাধীনতার দিক থেকে তত উদার। পয়েন্টের দিক থেকে শূন্য থেকে ৩০ হলে, সে দেশটি ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে স্বাধীন হিসেবে ধরা হয়েছে। পয়েন্ট ৩১ থেকে ৬০ হলে, সে দেশটিকে আংশিক স্বাধীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে ১৫ কোটি ৮৫ লাখ। ইন্টারনেট ব্যবহারের হার দেখানো হয়েছে ১০ শতাংশ। ২০১৪ সালের জুন মাস থেকে এ বছরের মে মাস পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে ব্লগার হত্যা, আইসিটি আইনে একজনের ৭ বছরের কারাদণ্ড, বিটিআরসি কর্তৃক মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন বন্ধ, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিষয়টিকে উল্লেখ করা হয়েছে।
এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের দেশে-দেশে অনলাইনে নজরদারি দেশের সংখ্যা বেড়েছে। ব্লগ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমত প্রকাশকারী ব্যক্তিদের ওপর সরকারি দমন-পীড়ন বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইন্টারনেট স্বাধীনতা পরিস্থিতির অবনতি বিশেষভাবে নজরে পড়ে। ২০১৪ সালের জুন থেকে এ পর্যন্ত মোট ৬৫টি দেশের মধ্যে ৩২টি দেশে অনলাইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কমেছে। এদের মধ্যে লিবিয়া, ফ্রান্স ও ইউক্রেনের অবনতি ‘বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য’।
ফ্রিডম হাউসের গবেষকেরা বলেন, বিশ্বের ৬১ শতাংশ মানুষ এমন সব দেশে বাস করে, যেখানে সরকার, সামরিক বাহিনী বা ক্ষমতাসীন ব্যক্তির পরিবারের সমালোচনার ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আর ৫৮ শতাংশ মানুষ এমন দেশে বাস করে, যেখানে অনলাইনে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয়ে মতামত জানিয়ে কারাবন্দী হতে হয়। গুগল, ফেসবুক ও টুইটারে প্রকাশিত নানা তথ্য সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের সরকার ব্যবহারকারীরা কতটা স্বাধীনভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন—এ নিয়ে ‘ফ্রিডম হাউস’ ৬৫টি দেশ নিয়ে গবেষণা চালায়।
এর আগে ২০১৩ সালে বিশ্বের ৬০টি দেশ নিয়ে গবেষণা করে ফ্রিডম হাউজ। ওই বছর ইন্টারনেট ব্যবহারে স্বাধীনতার দিক থেকে ১০০ এর মধ্যে ৪৯ নম্বর পেয়ে ‘আংশিক স্বাধীন’ ক্যাটাগরিতে স্থান পায় বাংলাদেশ। নতুন গবেষণা প্রতিবেদনেও একই অবস্থানে ছিল দেশ। ফ্রিডম হাউজের প্রতিবেদনে যে সব দেশ পয়েন্টের দিক থেকে শূন্য থেকে ৩০ পেয়েছে তারা ‘স্বাধীন’ ও যে সব দেশ ৩১ থেকে ৬০ পেয়েছে তারা ‘আংশিক স্বাধীন’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে।
এদিকে জরীপ করা বিশ্বের ৬৫টি দেশের মধ্যে ৬, ৭ ও ১৬ স্কোর নিয়ে ইন্টারনেট স্বাধীনতায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে যথাক্রমে আইসল্যান্ড, এস্তোনিয়া ও কানাডা। আর সবচেয়ে খারাপের মধ্যে আছে চীন, ইরান ও সিরিয়া। দেশ তিনটির স্কোর যথাক্রমে ৮৮, ৮৭ ও ৮৭। এ ছাড়া ৬৫টি দেশকে মোট তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইন্টারনেটের স্বাধীনতা আছে ১৮টি দেশে, আংশিক স্বাধীনতা আছে ২৮টি দেশে ও স্বাধীনতা নেই ১৯টি দেশে। বাংলাদেশের অবস্থান আংশিক স্বাধীনতার পর্যায়ে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ গত ২০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহকসংখ্যা ৫ কোটি ৪০ লাখ ৫৮ হাজার। এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেটই ব্যবহার করছেন প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ গ্রাহক। ওয়াইম্যাক্স ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৫ হাজার এবং আইএসপি ও পিএসটিএন ইন্টারনেট গ্রাহক ১৯ লাখ ১১ হাজার।
Comments
Post a Comment