আবারও হতাশ নদীপাড়ের মানুষ
লাল ফিতায় বন্দী তিস্তা চুক্তি
আবারও হতাশ নদীপাড়ের মানুষ
তিস্তা চুক্তি সর্বমহলে আলোচনার মূল খোরাক হলেও, বছরের পর বছর তা লাল ফিতায় বন্দী। ভারত ইচ্ছামতো তিস্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে বর্ষায় পানির গতি ছেড়ে যে উদার নীতির প্রকাশ ঘটায় তার উল্টা চিত্র দেখা যায় শুষ্ক মওসুমে। আর খরা মৌসুমে পানির অভাবে ডুকরে কেঁদে মরে এক সময়ের স্রোতস্বীনি তিস্তা। উজানে বাঁধ নির্মাণ করে ভারত তিস্তা নদীর পানি একতরফা প্রত্যাহার করায় শুকনো মৌসুমে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয় তিস্তা নদী। আবার বর্ষাকালে পানি ছেড়ে দেয়ায় পানির তোড়ে গ্রামের পর গ্রাম বিলীন হয়ে যায় সর্বগ্রাসী তিস্তার গর্ভে। খরা মৌসুমে নদীতে পানি না থাকায় এই পরিস্থিতি হয় আরও ভয়াবহ। তিস্তা নদীর কোল ঘেঁষা নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম বাইশপুকুর গ্রামের কৃষক আবু সাঈদ (৪০) জানান, বর্ষা মৌসুমে পানির প্রয়োজন হয় না নদীতে। তারপরেও ভারত সরকার প্রচুর পানি ছাড়ে, এতে আমাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ওই পানিতে তলিয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম। কিন্তু খরার সময় একটুও পানিও ছাড়ে না ভারত। তখন আমাদের প্রচন্ড কষ্ট করতে হয়। পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়। যদি দুই দেশের আলোচনা করে পানি ছাড়ার বিষয়টি সমাধান করে খরা মৌসুমে নদীতে পানি ছাড়ে ভারত, তবে আমাদের অনেক উপকার হবে।
জেলে রজব আলী (৪৫) জানান, এই তিস্তা নদীর পানির উপর নির্ভর করে থাকতে হয়। বর্ষাকালে দুই-তিন মাস নদীতে পানি থাকে, তখন নদীতে অনেক মাছ ধরা যায়। কিন্তু বর্ষা শেষ হলে নদী শুকিয়ে যায় তখন মাছ পাওয়া যায় না নদীতে। সেই সময় আমাদের অনেক কষ্ট করে দিন যাপন করতে হয়। মাছ ধরতে না পারায় পরিবার পরিজন নিয়ে অনাহারে দিন কাটাতে হয়। শামসুদ্দিন (৫০) নামের অপর কৃষক জানান, সারা বছর শুনি এবার পানি চুক্তি হবে। কিন্তু হয় না। এই পানির দাবিতে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল লংমার্চ করেও তার ফল শূন্য। দীর্ঘ চার-পাঁচ বছর থেকে নদীর পানি কমতে কমতে এ বছর শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ফলে পানির অভাবে এবার অনেক কৃষক বোরো ধান আবাদ করতে পারেনি। এদিকে সুন্দরখাতা গ্রামের আব্দুল বারেক (৫২) নামের এক মাঝি জানান, বর্ষার সময় যে পরিমাণ পানি নদীতে থাকে সে সময় অনেক মানুষ নদী পারাপার করে। তখন আমাদের অনেক টাকা আয় হয়। কিন্তু খরার সময় নদীতে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় তখন মানুষ হেটে নদীর পারাপার করে। সে সময় আমাদের দুর্দিন যায়। তখন ধারদেনা করে আমাদের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। যদি নদীতে সারা বছর পানি থাকত তাহলে আমাদের এই কষ্ট আর করতে হতো না।
সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর নিয়ে আশায় বুক বেঁধেছিল তিস্তাপাড়ের লাখো মানুষ। কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রতিবেশী বন্ধু দেশের সফর এজেন্ডায় তিস্তা ইস্যু না থাকায় আবার হতাশ তিস্তাপাড়ের কৃষক, জেলে, মাঝি-মাল্লাসহ লাখো মানুষ।
তিস্তাপাড়ের কৃষক খলিল মন্ডল (৬০) বলেন, আমরা এতদিন স্বপ্ন দেখছিলাম নদীর পানির চুক্তি হবে। কিন্তু আজ হয় কাল হয় করে আর হয় না। এরপরও আশা ছাড়িনি। এরই মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আজ শনিবার আমাদের দেশে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আলোচনা করবেন। সেখানে প্রথমে ছিল তিস্তা নদীর পানি চুক্তির বিষয়টিও। কিন্তু ৩ জুন টেলিভিশনের খবরে শুনলাম এ বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবিষয়ে কোন আলোচনা করবেন না। তার এই সিদ্ধান্তে আমরা দেশবাসী হতাশ। এতদিনের দেখা স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল। তবে তিস্তার বর্তমান দুর্দশার কথা স্বীকার করলেও হতাশ নন পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারত সরকারের এজেন্ডায় না থাকলেও বন্ধুপ্রতিম দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। পানি চুক্তি হলে বাংলাদেশের কৃষকদের ভাগ্যের দ্বার উন্মোচন হবে। তিস্তা বাংলাদেশ অংশে ন্যায্য হিস্সা পেলে এক কিউসেক পানিও বিফলে যাবে না এমন দাবিও করেন তিনি। তিস্তার পানি নিয়ে উত্তরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে যে আশার আলো দেখা দিয়েছিল তা বাস্তবায়নে উভয় দেশ দ্রুত পদক্ষেপ নেবে এই দাবি উত্তরাঞ্চলের মানুষের ।
Comments
Post a Comment